
আবু মুহাম্মদ
গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলায় শত শত নিরীহ ফিলিস্তিনি মুসলিম নিহত হওয়ার ঘটনায় বৈশ্বিক সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নেতৃত্বাধীন এই অভিযানগুলি কি সত্যিকার অর্থে “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”, নাকি এটি আসলে “ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”-এর প্রতিচ্ছবি? এই প্রশ্নের উত্তরে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতসহ বৈশ্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনে উচ্চারিত কিছু বক্তব্য ও ঘটনাবলির দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
টুলসি গ্যাবার্টের ভারতীয় গণমাধমের সাক্ষাৎকার
সাবেক মার্কিন কংগ্রেস সদস্য টুলসি গ্যাবার্ট গত সপ্তাহে ভারতে এক বক্তব্যে “ইসলামিক চরমপন্থা ও ইসলামিক খেলাফত ব্যবস্থার ধারণাকে” কে বৈশ্বিক সন্ত্রাসের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি দাবি করেন, “ইসলামিস্ট গোষ্ঠীগুলি গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য হুমকি”। তিনি যখন এই সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন তখন ভারতের মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরিতে তারাবির নামাজের সময় মসজিদে হামলা হয়। তার এই বক্তব্যের সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিম নাগরিকদের ওপর সহিংসতার ঘটনার প্রত্যক্ষ বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদে এক মসজিদে হামলার ঘটনায় ৫ মুসলিম নিহত হন। এছাড়া, হরিয়ানায় জাঠ নেতৃত্বে কৃষক আন্দোলনের সময় মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর কয়েকটি হামলার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু টুলসি গ্যাবার্ট তার বক্তব্যে কট্টর হিন্দুত্ববাদী এই বিষয় গুলোকে সন্ত্রাসবাদের সাথে তুলনা করেনি।
ট্রাম্প, নেতানিয়াহু ও গ্যাবার্টের বক্তব্যে যে দ্বৈততা গুলি ফুটে উঠে
১. ডোনাল্ড ট্রাম্প: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার ইসলামকে “সন্ত্রাসের ধর্ম” বলে আখ্যায়িত করেছেন। ২০১৭ সালে তার জারি করা “মুসলিম ট্রাভেল ব্যান” এবং “ইসলামিক টেররিজম” শব্দটির অবাধ ব্যবহার মুসলিম সম্প্রদায়কে সমগ্রভাবে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত করার নীতি প্রতিফলিত করে।যদিও মার্কিনিদের দ্বারা আফগানিস্তান, ইরাক এবং অন্যান মুসলিম দেশগুলোতে নিরীহ মুসলিমদের হত্যাকে তারা ওয়ার অন টেরর হিসাবে দেখায়।
২. বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু: ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী গাজা হামলাকে “হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” বলে চালিয়ে দিলেও, ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ৯০% হামলা বেসামরিক এলাকায় হয়েছে। নেতানিয়াহু সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছেন, “ইসলামিস্ট সন্ত্রাসবাদ মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বিশ্বের জন্য একই হুমকি”। যদিও তারা ওয়ার অন টেরর নামে দেড় বছরের যুদ্ধে ৬১,৭০০-এর বেশি নিরীহ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে , যার ৭০%ই নারী ও শিশু
৩. টুলসি গ্যাবার্ট: ভারতে তার বক্তব্যে তিনি “হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ” নিয়ে নিশ্চুথ থাকলেও, মুসলিম বিরোধী সহিংসতার কোনও নিন্দা করেননি। বরং, তিনি “ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামিক চরমপন্থার উত্থান” নিয়ে সতর্ক করেছেন।
এই নেতাদের বক্তব্যে একটি সাধারণ বিষয় লক্ষ্য করা যায় যা হলো “ইসলাম = সন্ত্রাসবাদ”। কিন্তু তাদের এই যুক্তি কি তাদের কাজের সাথে মিলে?
গাজায় শিশু ও নারী হত্যা: ইসরাইলি হামলায় ৬১,৭০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত, যার ৭০%ই নারী ও শিশু। অথচ, নেতানিয়াহু এটিকে “আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা” বলে দাবি করেন।
ভারতে মুসলিম নিপীড়ন: ট্রাম্প ও গ্যাবার্ট “ইসলামিক সন্ত্রাস”-এর ন্যারেটিভ জোরালো করলেও, ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর রাষ্ট্রীয় সহিংসতা (যেমন, NRC-CAA বিতর্ক, মোব লিঞ্চিং) তাদের বিবেচনায় আসে না।
মুসলিমদের ডিমোনাইজেশন: ট্রাম্পের “মুসলিম ব্যান” বা নেতানিয়াহুর “ইসলামিক টেররিজম” বক্তব্য মুসলিমদের একটি একজাতীয়, হুমকিস্বরূপ গোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন করে, যা বৈশ্বিকভাবে ইসলামোফোবিয়াকে বৈধতা দেয়।
এই ন্যারেটিভের সরাসরি প্রভাব দেখা যায় গাজা, ভারত ও পশ্চিমা দেশগুলিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর।
ভারতে ইসলামোফোবিয়া: ২০২০ দিল্লি দাঙ্গা, হিজাব বিতর্ক, বা উৎপল শর্মার মতো হিন্দুত্ববাদী নেতাদের মুসলিম-বিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয় পাচ্ছে।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ নীতি: ট্রাম্পের সময়ে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য ৩০০% বৃদ্ধি পেয়েছিল (সূত্র: FBI, ২০২১)।
ইউরোপে মসজিদ হামলা: ফ্রান্স ও জার্মানিতে মসজিদে হামলা হচ্ছে,হিজাবে এ রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে এবং মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করা হচ্ছে।
“সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”-এর নামে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে এই বৈশ্বিক প্রচারণা আসলে “ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” । গাজার হামলা, ভারতের মুসলিম নিপীড়ন, বা পশ্চিমা দেশগুলিতে ইসলামোফোবিয়া—সবই একটি ব্যবস্থাগত বিদ্বেষের প্রতিফলন, যেখানে মুসলিমদের নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা লঙ্ঘিত হচ্ছে। ট্রাম্প, নেতানিয়াহু বা গ্যাবার্টের বক্তব্যে এই দ্বৈততা স্পষ্ট: তারা “সন্ত্রাসবাদ” এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অজুহাতে সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছেন, যা আন্তর্জাতিক শান্তি ও ন্যায়বিচারের জন্য মারাত্মক হুমকি।